হৃদয়ে বাংলাদেশ - ধর্ম

দেশে ছিলাম আস্ত নাস্তিক। বোধহয় পুরোপুরি ঠিক বল্লাম না। আসলে ছিলাম সাধারন ধরনের বিজ্ঞান পড়ে সব কিছু অস্বীকার করতে চাওয়া, কিন্তু বিবেক আর সমাজের টানাপোড়েনের শিকল ভাঙ্গতে না পারা একজন। যুক্তিগুলো শুনে খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হতো, আবার একেবারে নাস্তিকও হতে পারতাম না। আমার ধারনা আমার মত মানুষের কথা একেবারে হাতে গোনা নয়।

তো এখানে এসে দেখি মনটা খালি দুর্বল লাগে। নামাজ পড়লে ভাল লাগে। সব বাঙ্গালী দেখি নামাজ পড়ে। বিরাট বিরাট দাড়ি ঝুলায়ে ঘুরে বেড়ায়। বিবেকের দংশনে পড়ে গেলাম। এখানে তো বাঙ্গালী কমিনিটি ছাড়া বাস করা মুশকিল। তার উপর মার কথা মনে পড়ে, ফোন করলে মা কান্নাকাটি করে। মনটাই খারাপ হয়ে যায়। মা, বউ আমাকে চারিত্রিক দিক দিয়ে ঠিক রাখার জন্য নামাজ পড়তে বলে। তাদের কথা ফেলেও দিতে পারিনা।

কিছুদিন আগে সহ ব্লগার সম্ভবত শোমোচৌ ভাইয়ের ব্লগে এরকম একটা লেখা খুঁজে পেয়েছিলাম। দেশের বাইরে আসলে মানুষ বেশী ধামির্ক হয়ে পড়ে।

যাই হোক এখন আমার অবস্থা আবার সেইরকম, ধরি মাছ না ছুঁই পানি। নাস্তিকদের তাল দেই আবার আস্তিকদের সাথেও ভাল সর্ম্পক রাখি। মাঝবয়সের সবদিক সামলে চলা একটা মানুষ...

(প্রথম প্রকাশ: সামহোয়্যারইন ব্লগ ২০০৬-০৪-১১)

কনজ্যুমার সোসাইটি


(এটি আসলে 'স্বপ্নের দেশ আমেরিকা'র ৪র্থ কিস্তি হওয়া উচিত)

আমেরিকা হল কনজ্যুমার ওরিয়েন্টেড সোসাইটি। কনজ্যুমার সোসাইটির একটা ফমার্ল সংজ্ঞা পেলাম এখানে। সংজ্ঞাটা আপনাদের জন্য বাংলায় বলি - এটি এমন একটি আধুনিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল সমাজ যেখানে ভোক্তা এবং পণ্য উভয়েরই আধিক্য রয়েছে।

সোজা কথায়, আমার মত একজন ছাত্র, যার কিনা নুন আনতে পান্তা ফুরায়, চাইলেই ২০০৭ মডেলের BMW, নিজের একটা বাড়ির মালিক হতে পারে। অনেকে বলবে ওয়াও, কি মজা! তাহলে আর পড়া লেখা করে কি হবে, কাজ কর্ম্ম করে কি হবে, জীবনে আর কি চাই। একটু সবুর করুন আপনাকে সমস্যাটা ধরিয়ে দিচ্ছি। তার আগে আসুন আপনাকে আরেকটু জ্ঞান দেই কিভাবে ব্যাপারটা চলছে।

কনজ্যুমার সোসাইটির পক্ষে কিছু পয়েন্টস পাবেন এখানে। আমি কয়েকটা পয়েন্টের অনুবাদ করছি:
২। ভোক্তা বিশাল পরিমানের টাকা খরচের মাধ্যমে ইকোনমি তরল রাখে এবং ভাল সরকার তৈরীতে সাহায্য করে।

৩ এবং ৪। এর ফলে দ্রুত প্রোডাক্ট ব্যবহার এবং রিসাইকেল হয়।

৬। এটি তৃতীয় বিশ্বকে সাহায্য করে।

এখন এর বিপক্ষে কিছু বলি। আমেরিকার অধিকাংশ লোকের কাছে মোবাইল ফোন আছে। অথচ সবার কাছে কিন্তু ল্যান্ড ফোনও আছে। ক'জনের একই সাথে দুটা দরকার? এখন মোটোরোলা নতুন একটা মোবাইল সেট বের করেছে, রেজর ভি থ্রি। যাদের মোবাইল আছে তাদের কি দরকার সেটটি? তাহলে তারা কিনবে কেন? সুতরাং মোটোরোলা রিবেট প্রস্তাব করল।

এই রিবেট জিনিসটি কনজুমার সোসাইটি ওরিয়েন্টেড ইন্ডাস্ট্রির একটি আবিষ্কার। মনে করুন একটি মোবাইল সেটের দাম ১০০ ডলার, তার উপর রিবেট ৫০ ডলার। আপনি প্রথমে ১০০ ডলার খরচ করে মোবাইল সেটটি কিনুন, কিছু শর্ত সাপেক্ষে কিছুদিন পরে এই ৫০ ডলার ফেরত পেয়ে যাবেন। তাদের লাভ হচ্ছে আপনার ৫০ ডলার বেশ কিছুদিন বাজারে খাটল। বেশ লোভনীয় মনে হচ্ছে না? কিন্তু শর্তগুলো এমন থাকে যে তা পালন করে, মনে করে অনেক সময় রিবেট ক্লেইম করাই হয়না। আর আমাদের মত তো আমেরিকানরা অতটা সর্তকও থাকে না। আমি নিজেই এতো সর্তক থাকার পরও ১৫০ ডলারের রিবেট মিস করেছি।

তো আসা যাক পুরোনো প্রসঙ্গে। মোটোরোলা রেজর ২০০ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু তার রিবেট ৩০০ ডলার অর্থাৎ মাস ছয়েক পর উলেটা আপনাকে ৩০০ ডলার ফেরত দিবে যাতে মোবাইলের জন্য আপনার খরচ তো হলইনা বরং ১০০ ডলার লাভ হল। তো শুরু হয় ধুমধাম সেল। যার লাগে সেও কিনে, যার লাগেনা সেও কিনে।

এভাবে আমেরিকান পোলাপানগুলো দামী দামী গাড়ি হাঁকায় র্গালফ্রেন্ড বশে রাখার জন্য ক্রেডিট কার্ড চার্জ করে করে বড় বড় বার এ ফুতির্ করে। আর বছর শেষে দেখে তার মাথায় মোটা অঙ্কের ঋণ ঝুলছে। তখন বাধ্য হয়ে শুরু করে দোকানে কাজ করা। কিছু আয় হয়, শুরু হয় আবার খরচ। এভাবে চলতে থাকে কনজ্যুমার সোসাইটির দুষ্টচক্র (vicious circle)।

ইন্ডাষ্ট্রির কিন্তু খুব লাভ। যেকোন প্রোডাক্ট বের হলেই চলে ধুমধাম। ছোটখাট ব্যবসা বানিজ্যও চলে সুরসুর করে। তাই তারা দেয় আরো ছাড় এবং তার সাথে অদৃশ্য ফাঁদ।

যাই হোক আমেরিকানরা বিষয়টা খুব এনজয় করে আর সেকারনেই এই ব্যপারটি চলতেই থাকবে এই সোসাইটিতে।


(দুঃখিত, খুব ভারী বিষয় নিয়ে আলোচনা করে ফেললাম।)

(প্রথম প্রকাশ: সামহোয়্যারইন ব্লগ ২০০৬-০৪-১১)

অ্যালেন গিনসবার্গ


(সহব্লগার শুভর পোস্ট পড়ে লিখতে ইচ্ছা হল। শুভকে কৃতজ্ঞতা।)

অ্যালেন গিনসবার্গ পরিচিত মূলত তার কবিতার জন্য। ষাট-আশির দশকের একজন অন্যতম মাকির্ন কবি এলেন গিনসবার্গ। তার পাগলামী অথবা প্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদও অনেকের আলোচ্য বিষয়। অনেকের দাবীমতে তিনি একজন গে ছিলেন।

তিনি একাত্তরের সময় বাংলাদেশে এসেছিলেন এবং September On Jessore Road নামে একটি কবিতা লিখে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। কবিতাটি থেকে কয়েকটি লাইন:
Millions of fathers in rain
Millions of mothers in pain
Millions of brothers in woe
Millions of sisters nowhere to go
কবিতাটিতে তিনি যশোর রোডে ৭১ এর উদ্বাস্তুদের নিয়ে বলেন। আরো সমালোচনা করেন উন্নত বিশ্বকে:
How many millions of children die more
before our Good Mothers perceive the Great Lord?
How many good fathers pay tax to rebuild
Armed forces that boast the children they've killed?
পুরো কবিতাটি পাওয়া যাবে এখান থেকে

ভারতে এসে হাংরি মুভমেন্টের প্র্রভাবে ন্যুনতম ভোজন, পোশাক এবং জীবন যাত্রায় অভ্যস্ত ছিলেন। তখন ভারতের কবি সাহিত্যিকদের আসরে ছিল তার যাতায়াত। আমি যতদুর জানি সুনীল, শক্তি এরা জানতেন তাকে।

তিনি সাহিত্যে বীটস জেনারেশনের প্রবক্তা। মার্কসবাদ, নগ্নতাবাদ, নারীবাদ ইত্যাদি নানা মতবাদের অন্যতম বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। নগ্নতাবাদীরা মনে করে ঈশ্বর মানুষকে নগ্ন করে পাঠিয়েছেন তাই মানুষের সেরকমই থাকা উচিত।

তার অন্যতম কবিতা ক্যাডিশ, তার মস্তিষ্ক বিকৃত মাকে নিয়ে লেখা। কোথাও এর একটা বাংলা অনুবাদও দেখেছিলাম। ইংরেজী মূল লেখাটি পাবেন এখানে
এছাড়া Howl নামেও তার একটি বিখ্যাত রচনা আছে। পাবেন এখানে

১৯৯৭ এর এপ্রিলে তিনি যখন মারা যান তখন আমি তার সর্ম্পকে জানতে পারি দেশ পত্রিকার মাধ্যমে। পরের বইমেলাতে তাই বেশ কিছু লেখার বাংলা অনুবাদও পাওয়া গিয়েছিল। আজিজ মাকের্টের দোকানগুলোতে খুঁজলে হয়ত এখন পাওয়া যাবে লেখাগুলো।

তার সম্ব্যন্ধে আরো জানতে হলে www.allenginsberg.org বা www.kirjasto.sci.fi/ginsberg.htm এ যেতে পারেন।

(প্রথম প্রকাশ: সামহোয়্যারইন ব্লগ ২০০৬-০৪-১০)

প্রিয় ছোট গল্প - The Last Leaf


ও হেনরীর নাম শুনলে অনেকেরই হয়ত জিম আর ডেলার কথা মনে পড়ে যাবে। উচ্চমাধ্যমিকের পাঠ্য হিসেবে The Gift of the Magi গল্পটি অনেকেরই পড়া।

ও হেনরীর আরেকটি খুব ভাল ছোট গল্প হচ্ছে The Last Leaf। ভাবছিলাম গল্পটি অনুবাদ করে এখানে পোস্ট করব। কিন্তু তার অসাধারন ভাষা শৈলীর কতটা অনুবাদে আসবে সে ব্যপারে সন্দিহান ছিলাম। গুগোলকে জিজ্ঞেস করতেই একটি লিঙ্ক পেয়ে গেলাম। আশা করি গল্পটি আপনাদের ভাল লাগবে।

(প্রথম প্রকাশ: সামহোয়্যারইন ব্লগ ২০০৬-০৪-০৯)

হৃদয়ে বাংলাদেশ: সংস্কৃতি



বাংলাদেশে থাকতে মূল্য বুঝি নাই। টেলিভিশনের নাটক খারাপ, সিনেমা খারাপ, বাংলাদেশের বেশীরভাগ সঙ্গীত পছন্দ হয়না, এইসব ব্যাপার নিয়ে অভিযোগ করতাম। শুনতাম পশ্চিমা সঙ্গীত, হলিউডে বক্স অফিস হিট করল যেটা দেখতাম সেটাই, কথা বলতাম ইংরেজী মিশিয়ে, জিনস প্যান্ট পরে ভাবতাম এটাই বুঝি আসল সংস্কৃতি।

আমেরিকায় এসে প্রথম প্রথম ভাবতাম আহ আমার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ। কিন্তু রঙ চটে যেতে সময় লাগল না। তখন শুরু করলাম ওয়েবসাইট ঘেঁটে ঘেঁটে, নাটক, গান এসব খুঁজে বার করা। বাংলাদেশী সংস্কৃতিকে যেন নতুন ভাবে আবিষ্কার করলাম। এখন ছোটখাট বাংলাদেশী অনুষ্ঠানে যেতে খুব মজা পাই। দেশ থেকে কেউ আসার কথা শুনলে খোঁজ নেই, কোন নতুন নাটক এনেছে কিনা। কোন নতুন এলবাম বের হলে খুঁজে বের করি কোথায় ডাউনলোড করা যাবে।

ব্যাপারটা শুধু আমারই না, বরং মোটামুটি সব বাঙ্গালীরই হয়। কেজানে হয়ত যে কোন দেশের লোকেরই ব্যাপারটা হয়। জলে থেকে কে বোঝে জলের মর্ম!

(প্রথম প্রকাশ: সামহোয়্যার ইন ব্লগ ২০০৬-০৪-০৯)

ফ্রাইডে কালচার

ফ্রাইডে হল আমেরিকার সাপ্তাহিক উইকএন্ড। সপ্তাহ শেষে ঠিক দুদিন ছুটির আগের সময়টা। এদিন দুপুর তিনটার মধ্যে মোটামুটি অফিস আদালত ফাঁকা হয়ে যায়। সন্ধ্যা থেকে বেড়ে যায় রাস্তায় গাড়ির পরিমান, গাড়ির স্পিডিং এর দাপট, হঠাৎ চেপে ধরা ব্রেকের স্ক্র্যাচিং এর শব্দ। সেইসাথে বেড়ে যায় পুলিশের গাড়ি, এম্বুলেনস, ড্রাইভিং আন্ডার ইনফ্লুয়েনস (মদ খেয়ে গাড়ি চালানো) এনফোরসমেন্ট এর ভ্যান আর একসিডেন্ট। রাত তিনটা চারটা পর্যন্ত বার এ চলে হই চই, রাস্তায় চেঁচামেচি, উচ্চস্বরে গান বাজনা ইত্যাদি। ঘুমোনোই দায় হয়ে যায়।

প্রথম যখন আসলাম, জাস্ট অফ দা বোট (গেরাম থেকে সদ্য আসা আবুল (হাসি) ) তখন তো এইসব দেখে ভয়ই লাগত। পার্কিং স্ট্রাকচার গুলো ভেতর দেখতাম মাতাল মেয়েগুলো চেঁচামেচি করছে, বমি করছে, ভয়ই পেয়ে যেতাম। সাদা মেয়েগুলো যেন ছেলেগুলোর চেয়ে বেশী ড্রিঙ্কস করে। এখন এদের দেখে করুনা হয়। কোন নরকেই না পৌছেছে বেজন্মাগুলো। হাসি পায় যখন টেলিভিশনে নানাভাবে মদ খাওয়া থেকে বিরত করতে চেয়ে বিজ্ঞাপন দেয়।

একজন ইন্ডিয়ান বন্ধু তার রুমমেটের কাছ থেকে শোনা অভিজ্ঞতার কথা জানায়। সেই লোক ট্যাকো বেল (একটি মেক্সিকান ফাস্ট ফুডের দোকান) এ ম্যানেজার। প্রায় ফ্রাইডে নাইটে নাকি সাদা মেয়ে গুলো দোকানে আসে, এসে জানতে চায় would you give me a burrito if I show my boobs?, বুক দেখালে খাবার দেবে? বুরিতো হচ্ছে একটি মেক্সিকান খাবার। অনেকে রাজি হয়, অনেকে হয়না। তো এই ইন্ডিয়ান লোকটি একবার এরকম পরিস্থিতে বলল, ভেবে দেখতে পারি, যদি তোমার বুক সুন্দর হয়। তখন মেয়েটির বুক দেখে লোকটি জানায়, নাহ পছন্দ হয়নি আমার, খাবার মিলবে না।

আমার ল্যাবের মেক্সিকান ছেলেটা শেষ পর্যন্ত বাড়ি ছাড়ছে বাধ্য হয়ে, তার পাশের ফ্ল্যাটের মেয়েটার ফ্রাইডে পাটির্র অত্যাচারে।

তবে বিষয়টা সম্পূর্ণ এজ গ্রুপের ওপর ডিপেন্ড করে। আমি ইউনিভাসির্টির খুব কাছে থাকি, উপরন্তু ডাউনটাউনে থাকি। সুতরাং এখানটায় ব্যাপারটা খুব প্রকট। আর প্রচুর আমেরিকান কিন্তু বেশ ভাল এবং এরকম যা ইচ্ছা তাই করে না। তবে বেশ বড় অংশ এরকমটা করে থাকে বলে এটা এখন আমেরিকানদের একটা বড় মাথা ব্যাথার বিষয়।

(প্রথম প্রকাশ: সামহোয়্যার ইন ব্লগ ২০০৬-০৪-০৯)